হাল বৈশাখে বাবা বলতেন…

আরিফ সাওন : তখন তো অনেক ছোট। তা প্রায় ২৪ থেকে ২৫ বছর আগের কথা। পয়লা বৈশাখকে আমাদের এলাকায় ‘হাল বৈশাখ’ বলা হতো। আমাদের বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলায় তখন মাছের ঘেরের প্রচলন শুরু হয় নি। কোথাও কোথাও অনেক আগের দুইটা একটা ঘের দেখা যেতো। সেগুলো হয়তো মেম্বার-চেয়ারম্যান বা কোনো ধনাঢ্য ব্যক্তির।

তবে আমাদের আশপাশে কয়েকটি উপজেলা যেমন- রামপাল, মংলা, মোড়েলগঞ্জে ব্যাপক হারে চিংড়ি চাষ হচ্ছিল। বিশেষ করে লবণ পানির এলাকায় বাগদা চিংড়ি। আর আমাদের কচুয়ায় চাষ হতো ধান। আমাদের দিকে লবণ পানি কম আসতো। বাঁধ দিয়ে লবণ পানি আসা রোধ করে ধান চাষ করা হতো।

তখন প্রায় গৃহস্থের দুই চার পাঁচটা গরু ছিলো। কারো বা মহিষ। যাদের একটু বেশি ধানী জমি ছিলো তাদের মহিষ ছিলো। মহিষ দিয়ে অল্প সময়ে বেশি জমিতে হাল চাষ করা যেতো। গরমের সময় প্রায়ই দেখতাম বড় খালের পানিতে গা ড়ুবিয়ে মহিষগুলো নাক মুখ তুলে ‘জাবড়ি’ দিয়ে আছে। কোনো কোনো মহিষ খালের পাশের ঘাস খাচ্ছে। জমিতে হাল চাষের পর দুপুরের দিকে মহিষগুলো খাল পাড়ে ছেড়ে দেওয়া হতো। ঘাঁস লতা খেয়ে পেট ভরার পর গরমে তারা খালের পানিতে গা ডুবিয়ে দিতো। আমরা কখনো কখনো গা ডুবিয়ে দেওয়া মহিষের পিঠে চড়ে বসতাম। অনেক সময় ভয়ও লাগতো।

এতো কথার কারণ হচেছ পয়লা বৈশাখকে ‘হাল বৈশাখ’ কেন বলা হতো সে বিষয়ে সহজ করার জন্য। যারা ধান চাষ করতেন তারা সবাই পয়লা বৈশাখে নিজ নিজ জমিতে হাল চাষ করতেন। বৈশাখের প্রথম দিনে সকালে ঘুম থেকে উঠে হালের গরু/মহিষ আর লাঙ্গল-জোয়াল নিয়ে নিজ নিজ জমিতে গিয়ে এক ফিরে জমি চষতেন। মাঠে তাকালেই দেখা যেতো- জমিতে জমিতে হাল চাষের অন্য রকম দৃশ্য। যেন ‘গাতা’ বেঁধে সবাই হাল চষছেন।

তারা মনে করতেন, বৈশাখের প্রথম দিনে হাল চাষ করলে তাদের চাষবাস ভালো হবে। যাদেরই জমি এবং গরু-মহিষ ছিলো; যারা ধান চাষ করতেন, পয়লা বৈশাখে সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রার্থনার পর (যার যার ধর্ম অনুযায়ী) প্রথম কাজই ছিলো জমিতে এক ফিরে চাষ দেওয়া। আর যারা প্রার্থনা না করতেন, তাদের দিনের প্রথম কাজই ছিলো হাল চাষ। এ জন্য তারা পয়লা বেশাখকে হাল বৈশাখ বলতেন।

আরো পড়ুন :   নিজেদের চেয়ে প্রতিপক্ষকে এগিয়ে রাখতে নারাজ সৌম্য

বৈশাখ আসার আগেই ‘হাল বৈশাখ’ পালনের প্রস্তুতি শুরু হতো। বাবা ভালো ভালো বাজার করতেন। বাবা বলতেন- হাল বৈশাখের দিন যেভাবে যাবে; সারা বছরও ঠিক সেই ভাবে যাবে। তাই এই দিন ভালো ভাবে চলতে হবে। সবার সাথে ভালো ব্যবহার করতে হবে। কারো সাথে ঝগড়া করা যাবে না। এমন ভাবে চলবে, তোমার কথা বা কাজে কেউ যাতে কষ্ট না পায়। এদিন যদি কারো সাথে ঝগড়া বা মনোমালিন্য হয়- তাহলে সারা বছরই মানুষের সাথে ঝগড়া লেগে থাকবে। সেজন্য সবার সাথে মিলে মিশে হাসি খুশিতে দিনটি কাটানোর তাগিদ দিতেন।

খুব ভোরে ঘুম থেকে ডেকে তুলতেন। এরপর পড়তে বসাতেন। যখন আরেকটু বড় হলাম। তখন মা-বাবা ঘুম থেকে ডেকে নামাজ পড়তে বলতেন। পড়তাম। কোরআন পড়া শেখার পর থেকে কোরআন পড়তে বলতেন। এরপর বই পড়তে বসতাম। আর বাবা গরু, লাঙ্গল-জোয়াল নিয়ে যেতেন জমিতে চাষ দিতে। আমাদেরও ৫/৬ টা গরু ছিলো। কিছুক্ষণ বই পড়ার পর মায়ের কাছে শুনে নিতাম, বাবা কোন জমিতে চাষ দিতে গেছেন। আমিও সেখানে যেতাম। হাল চাষ করার পর মাঠে ঘাঁস খেতে গরুগুলো বেঁধে রেখে রোদ চড়ার আগে বাবার সাথে বাড়ি আসতাম।

সাড়ে আটটা নয়টার দিকে মা সকালের নাস্তা দিতেন। নাস্তায় পান্তা ইলিশের কোনো বাধ্যবাধকতা ছিলো না। অন্য দিন পান্তা কিংবা ফ্যানে ভাতে ডিম ভাজা, তেলে ভাজা মরিচ কিংবা কাঁচা মরিচ-পেয়াজ কুচা দিয়ে দিলেও এদিন গরম ভাত রান্না করতেন। সাথে ঘি আর আলু ভর্তা। ডালও থাকতো। বাবা বলতেন ঘি খেলে নাকি ‍বুদ্ধি বাড়ে। তখন ঘিয়ের দাম এখনকার মত এতো বেশি ছিলো না। আমাদের এলাকায় বিখ্যাত ছিলো অধীরের (অধির কাকা) ঘি। তিনি ঘি আর ঘোল বিক্রি করতেন।

আরো পড়ুন :   IND VS BAN 1st T20 : ভারতকে দেখিয়ে দিল টাইগাররা

দিনের অন্যান্য বেলায়ও ভালো ভালো রান্না হতো। খাওয়ার সময় বাবা বলতেন, বড় রুই মাছের মাথাটা ওকে দাও। রুই মাছের মাথা খেলে মাথা ঠান্ডা থাকে। বুদ্ধিসুদ্ধিও ভালো হয়। মাও আমাকে রুই মাছের মাথা দিতেন।

দুপুর খাওয়ার পর একটু বিশ্রাম নিয়ে দল বেঁধে যেতাম মেলা কিংবা ষাঁড়ের লড়াই দেখতে। কোনো কোনো বছর যেতাম হাল খাতা খেতে। শুধু মেলা বা ষাঁড়ের লড়াই দেখতে গেলে বাবা বলে দিতেন- কারো সাথে ‘বাধাবাধি’ করবা না। আবার কোনো কোনো বছর যেতাম ‘চড়ক পুজা’ দেখতে ।

আমাদের ওখানে শিব বাড়ির মাঠে ‘চড়ক পুজা’ হয়। বৈশাখের বিশেষ আকর্ষণ ছিলো এই চড়ক পুজা। বরশিতে বেঁধে শূণ্যে মানুষ ঘোরানো হয়।

ছোট বেলা বুঝতেই পারতাম না কিভাবে একটা মানুষকে এভাবে বরশিতে বেঁধে ঘুরানো সম্ভব! মনে হয় কোনো জাদু টোনা আছে। সাংবাদিকতায় আসার পর ২০১৪ সালে বিষয়টা কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে।

এই অনুষ্ঠান দেখার জন্য সকাল থেকে দেশ-বিদেশের অসংখ্য দর্শনার্থী এসে ভিড় জমান। খেলাটা শুরু হয় বিকেল তিনটার পর। খেলা দেখানোর জন্য মাটিতে পোতা গাছের কাছে এসে প্রার্থনা করেন খেলোয়াড়রা। দলের অন্য সদস্যরা মূল খেলোয়ারদের মাঠে শুইয়ে রেখে, পিঠে সিঁদুর দেয়ার পর লোহার হুক (বরশি আকৃতি) ফোটায়। বরশি গায়ে দিয়ে নাচতে থাকে তারা।

লাল কাপড় যায় দর্শনার্থীদের কাছে। দর্শনার্থীরা সামর্থ মত পূণ্যের আশায় লাল কাপড়ে টাকা দেয়। টাকা আদায় শেষে একপর্যায়ে দড়ির সাথে বরশি বেধে শুরু হয় শূণ্যে ঘুরানো। ঘোরা অবস্থায় খেলোয়াড়রা বাতাসা ছড়াতে থাকে। আর উপস্থিত দর্শনার্থীরা তা পেয়ে নিজেকে সৌভাগ্যবান ভেবে নেয়। দশ মিনিট করে এভাবে ঘোরানো হয় মোট দু’জন কে।

এ দিন মুল খেলা দেখান গোপলগঞ্জের সদর উপজেলার ঠুঠাভাঙ্গা গ্রামের রাধাকান্ত রায়ের ছেলে সজীব রায় (১৮) ও একই গ্রামের বাবুরাম বিশ্বাসের ছেলে রিপন বিশ্বাস (১৯)। তারা জানান, এটা একটি গাছড়ার গুন। যার কারণে রক্ত বের হয় না। ব্যাথা অনুভূত হয় না। একেক জন খেলোয়াড় জীবনে মাত্র সাত বার এই খেলায় অংশ নিতে পারে। এটা এক ধরনের সাধনা। গুরুর কাছ থেকে এ খেলা তারা শিখেছেন। টাকা-পয়সার জন্য তারা এ খেলা দেখান না। তারা শুধু পূণ্যের আশায় এবং মনের আনন্দে দর্শনার্থীদের আনন্দ দেয়ার জন্য এ খেলা দেখান।

আরো পড়ুন :   গোয়াইনঘাট থানা কম্পাউন্ড থেকে পুলিশ সদস্যের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার

চড়ক পুজা দেখে বাড়ি ফিরে হাত-মুখ-পা ধুয়ে সন্ধ্যায় পড়তে বসতাম। কিছুক্ষণ পড়ার পর মায়ের সাথে এঘরে সেঘরে বেড়াতে যেতাম। কখনো কখনো আমাদের ঘরেও অনেকে আসতেন। আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি থাকতো না। কখনো মোল্লা বাড়ির ভিটেয় লাঠি খেলা হতো। গ্রামীণ বাদ্য যন্ত্র বাজিয়ে গান বাজনা হতো। কী যে ভালো লাগতো! নজু কাকু বাজাতেন পাতার বাঁশি!

এখন আর নজু কাকু পাতার বাঁশিতে সুর তোলেন না। এখন আর বাবা মা সকালে ঘুম ভাঙ্গিয়ে নামাজও পড়তে বলেন না, বলেন না বইও পড়তে বসতে। বাবা মা গ্রামে থাকেন। আর আমি কর্মব্যস্ত রাজধানী ঢাকাতে। তাদের শহর ভালো লাগে না। সেই গ্রামটাই তাদের সবচেয়ে আপন। ঢাকায় আসলেই দুই চারদিন থাকার পর গ্রামে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এখন আর হাল বৈশাখে বাবাও হালের বলদ নিয়ে মাঠে যান না । আমাদের গরুগুলোও নেই। নেই সেই ফাঁকা মাঠ। সেসব মাঠে এখন মাছের ঘের। তবে ধান চাষ হয়। কিন্তু আগের মত নয়। তাতে লেগেছে প্রযুক্তির ছোয়া। সবাই এখন চাষ করেন যন্ত্রে। আবার কখনো কখনো মানুষও গরুর মত জোয়াল কাঁধে নিয়ে হাল চাষ করেন।

এখন আর গৃহস্তের গোয়ালে গরু নেই। মহিষের দেখা মেলা ভার। হাল বৈশাখের সকালে জমিতে জমিতে দেখা মেলে না সেই ২৫ বছর আগের হাল চাষের দৃশ্য। হাল চাষসহ অন্যান্য সব ঐহিত্য হারিয়ে গেলেও এখনো চড়ক পুজা ঠিক মত হচ্ছে। কিন্তু সেই চড়ক পুজা দেখতে যাওয়ারই বা সময় কই! তবে শত ব্যস্ততার মাঝেও চিন্তা থাকে শুধু বাবার কথাটা মানার। যাতে আমার কথা বা কাজে কেউ যেন কষ্ট না পায়।

লেখক: সাংবাদিক

press.arifkk@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published.