হাইওয়েতে এক রাতে: তানজিদ রাহমান

হাইওয়েতে এক রাতে
-তানজিদ রাহমান

নিস্তব্দ রাত্রি, ঘুটঘুটে অন্ধকারে ছেয়ে আছে চারপাশ। এরই মধ্য দিয়ে চলে গেছে এক প্রশস্ত হাইওয়ে। দুপাশে ঘন ঝোপঝাড়, আর রাবারের বন। মাইল দশেক এর মধ্যে মনুষ্য বসতি আদৌ আছে বলে মনে হয় না। রাশেদ এমন গা ছমছম করা পরিবেশে একরকম বাধ্য হয়েই তার গাড়িটি নিয়ে যেতে রাজি হয়েছে। স্ত্রীর আবদার বলে কথা। ফোনেই তো কেঁদে একেবারে চোখের জল নাকের জল এক করে ফেলেছিল। না গেলে কি যে হবে কেই বা জানে। অগত্যা সে বেরিয়ে পড়ল এই অসময়ে। কিন্তু হঠাত ‘ঠপাস’ শব্দ করে টায়ারটা ব্লাস্ট হল। ঘটনার আকস্মিকতায় হচকচিয়ে গেল রাশেদ। সে ভালোই জানে আশেপাশে কোন বসতি নেই। এই অবস্থায় সাহায্য কোথায় পাবে কথাটা ভাবতেই ভয়ে তার শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল জলের স্রোত বেয়ে পড়লো। এদিক একপাশ দিয়ে শাঁ শাঁ করে একটার পর একটা গাড়ি চলে যাচ্ছে। কিন্তু কারোরই সামান্যতম মানবতা দেখানোর প্রয়োজন মনে হল না। অবশ্য এই অবস্থায় সেই গাড়ি থামাত কিনা সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। হঠাত রাবারের বনের গভীরে একটা আলো নজরে এল। যাক, অন্তত ওখানে সাহায্য পাবার মত কাউকে পাওয়া যাবে, ভাবল রাশেদ। সৌভাগ্যক্রমে রাবার বাগানের ভেতর দিয়ে পায়ে-চলা একটা পথ চলে গেছে। ক্লান্ত শরীরটা টেনে-টুনে আলোর দিকে এগুতে লাগল এই পথটা ধরে।
কাছাকাছি হতেই নির্মাণ শ্রমিকদের কাঠের তৈরী দুতলা কাঠামো চোখে পড়ল। কোন নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলছে বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু এই বনে কেন বুঝে উঠতে পারল না রাশেদ। বাড়িতে পৌছার আগেই বৃষ্টি শুরু হলো। অল্প সময়ের মধ্যে বৃষ্টি বেগ বেড়ে গেল। চালাঘরটার সামনে যখন পৌছল ততক্ষণে ভিজে একসা হয়ে গেছে।
জোরে দরজায় ধাক্কা দিল সে। গেঞ্জি আর পাজামা পরা একটা লোক দরজা খুলল। তার সমস্যাটা খুলে বলল রাশেদ। তারপর জানতে চাইল তাদের এখানে ফোন আছে কিনা আর সেটা সে ব্যবহার করতে পারবে কিনা। শ্রমিক লোকটা তখন বলল, ‘গাড়িটা যদিও এখন ঠিক করতে পারবে তবুও এই আবহাওয়ায় গাড়ি চালানো ঠিক হবে না তোমার। তার চেয়ে বরং রাতটা এখানে কাটিয়ে দাও। সকালে আমরা দেখব তোমার গাড়ির জন্য কি করতে পারি।’
রাশেদ মনে মনে কৃতজ্ঞ হয়ে উঠল লোকটার প্রতি। ভেতরে তাকিয়ে আরো দুজনকে দেখতে পেল। তিনজনে মিলে তাস খেলছিল। লোকগুলো তাকে বলল ওপরতলায় উঠে বিছানায় শুয়ে পড়তে। তারা রাতভর খেলা চালিয়ে যাবে। লোকগুলোকে ধন্যবাদ জানিয়ে কাঠের সিড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এল সে। এখানে এসে অবাক হয়ে দেখল কিছু আসবাবপত্র এমনকি আয়নাসহ একটা ড্রেসিং টেবিলও আছে কামরাটায়। তবে ওটা নিয়ে বেশি একটা চিন্তা করল না। কাপড় ছেড়ে চারটা বিছানার একটায় শুয়ে পড়ল সে।
রাতের কোন এক সময় রাশেদের ঘুম ভেঙে গেল। এসময়ই দেখল সাদা পোশাকপরা এক মহিলা ড্রেসিং টেবিলে বসে ধীরেসুস্থে তার লম্বা চুল আচড়াচ্ছে। এক পর্যায়ে রাশেদকে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখল মহিলাটি। চিরুনিটা নামিয়ে রেখে তার দিকে ফিরে একটা হাসি দিল। কি কিরা উচিত বুঝতে না পেরে পালটা হাসলো রাশেদও।
তারপরই নিজের মাথাটা ধড় থেকে নামিয়ে ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখল মহিলাটি।
বিস্ময়ে টিকরে বেরিয়ে আসতে চাইলো রাশেদের চোখ। আতংকে চিৎকার করতে চাইল সে। কিন্তু গলা দিয়ে কোন আওয়াজ ভের হল না। মহিলাটি নড়ছে না। তবে টেবিলের ওপর রাখা মাথাটি তার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
থরথর করে কাঁপছে রাশেদ। সে সপ্ন দেখছে না তো? হয়ত সে তার বাসায় মখমোলের চাদরে মোড়া খাটে শুয়ে আছে। এসব কিছুই সত্যি না।
কিন্তু তাকে নিরাশ করে দিয়ে এসব সত্যিরুপেই আবির্ভূত হলো।
শেষ পর্যন্ত নিজের ওপর নিয়ন্ত্রন খুজে পেল রাশের। পড়িমরি করে সিড়ি বেয়ে নীচে নেমে এল সে।
দেখল নিচের তিনজন এখনও শান্তভাবে তাস খেলছে। ‘বাচাও,বাচাও,’ হাফাতে হাফাতে বলল রাশেদ। ‘ওপরে একটা মহিলা দেখে এলাম, মাথা খুলে ফেলল চোখের সামনে।’
তিনজন তাসুড়ে খেলা থামিয়ে তার দিকে তাকিয়ে হাসল। এরপর একজন একজন করে নিজেদের মাথা খুলে টেবিলে রাখতে লাগল। খুলে রাখা মুন্ডুগুলোতে প্রশস্ত হাসি। আর চোখে নির্দয় আক্রোশ!

আরো পড়ুন :   কপিল শর্মা ও তার দল; যেন কমেডির অ্যাভেঞ্জার্স