ভিনদেশি সিনেমায় বাংলাদেশ, বাংলাদেশে ভিনদেশি সিনেমা

বিদেশী সিনেমায় বাংলাদেশের নাম বা প্রসঙ্গ আসলে সহজাতই বাংলাদেশী হিসেবে আমাদের একটা অন্যরকম অনুভূতি কাজ করে। প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় ও সবচেয়ে বেশি যৌথ প্রযোজনার সিনেমা করায় বিদেশী দেশ হিসেবে ভারতেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বের সাথে বাংলাদেশের প্রসঙ্গ এসেছে।

তবে আজ আমরা দেখবো ভারত বাদে বিশ্বের আর কোন কোন সিনেমাতে বাংলাদেশ ও এর সংস্কৃতি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে শুরু করা যাক।


১. Around the World in 80 Days (1956):- ১৮৭২ সালে এক ইংরেজ ভদ্রলোক চ্যালেঞ্জ করে বসেন তিনি মাত্র ৮০ দিনে সারা বিশ্বভ্রমণ করবেন। অতঃপর বিশ্বস্ত ও চতুর এক সহযোগীকে নিয়ে তিনি একটি গ্যাস বেলুনে করে তার অভিযাত্রা শুরু করেন।

বিভিন্ন দেশে গিয়ে বিভিন্ন ঘটনা-দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়ে শেষপর্যন্ত তারা ৮০ দিনের মধ্যেই বিশ্বভ্রমণ শেষ করে নিজেদের দেশে ফিরেন। জুল্স ভার্ন রচিত Around The World In Eighty Days এর এমনই গল্প অবলম্বনে মাইকেল আন্ডারসন একই নামে ১৯৫৬ সালে এই আমেরিকান সিনেমাটি নির্মাণ করেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে একাধিক অস্কারজয়ী এই ছবিটির বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাংলাদেশেও শুটিং হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটে হয়েছে ছবিটির কিছু দৃশ্যের শুটিং। ছবিটির একটি দৃশ্য ছিল এ রকম, ট্রেন ছুটছে। হঠাৎ চালক খেয়াল করলেন, লাইনের সামনে একপাল হাতি আপনমনে চড়ে বেড়াচ্ছে। ট্রেন থেমে যায়। কামরা থেকে নেমে আসেন নায়ক ডেভিড নিভেন, ব্যাপারটা কী দেখতে। সামনের গ্রামেই তখন হচ্ছিল সতীদাহ। নায়ক ছুটে গিয়ে মেয়েটিকে বাঁচান। মেয়েটি হলো শার্লি ম্যাক্লেইন। ছবির এই অংশটুকুই চিত্রায়িত হয়েছিল লাউয়াছড়ার রেললাইন এলাকায়। হলিউডের শুটিং ইউনিটকে সহযোগিতা করেছিলেন তৎকালীন দেশীয় চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ফতেহ লোহানী।

আরো পড়ুন :   সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত ১০টি বাংলাদেশি সিনেমা

২. Bandhobi (2009):- পারিবারিক সমস্যার কারণে অতিষ্ট এক দক্ষিন কোরিয়ান মেয়ে এবং প্রাপ্য বেতন পেতে মরিয়া এক বাংলাদেশী অভিবাসী শ্রমিকের বন্ধুত্ব ও প্রেমের গল্প নিয়ে সীন ডঙ-ইল্ ২০০৯ সালে নির্মাণ করেন দক্ষিন কোরিয়ান মুভি Bandhobi (বান্ধবী/মেয়ে বন্ধু)। ছবিটিতে সেই মেয়ের চরিত্রে ছিলেন বায়েক জিন-হী এবং বাংলাদেশের অভিবাসী যুবকের চরিত্রে মাহবুব আলম পল্লব।

ছবিটিতে দক্ষিন কোরিয়ার মধ্যবিত্ত পরিবারের সমস্যা ও বাংলাদেশী অভিবাসী শ্রমিকদের দুঃখ দুর্দশার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ছবিটি ৫টি আন্তর্জাতিক পুরস্কারের পাশাপাশি বেশ প্রশংসা অর্জন করে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মাহবুব আলম পল্লবের অভিনয়ের সকলে ভূয়সী প্রশংসা করেন।

৩. Avengers: Age Of Ultron (2015):- মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায় কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন রোবট আলট্রন। তখনই ত্রাণকর্তা হিসেবে ঝাপিয়ে পড়ে সুপারহিরোদের সংগঠন অ্যাভেঞ্জার্স। এমনই গল্প নিয়ে জশ হেডন ২০১৫ সালে নির্মাণ করেন আমেরিকান সুপারহিরো মুভি Avengers-Age Of Ultron.

খুব গোপনীয়তার সাথে এই সিনেমাটির কিছু অংশের শুটিং হয়েছিল চট্টগ্রামের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে। বাংলাদেশে বিভিন্ন ফুটবল ক্লাবের বিদেশী কৃষ্ণবর্ণের খেলোয়াড়দের এই সিনেমায় হায়ার করা হয়। বাংলাদেশী অংশে শুটিংয়ের সময় সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন তারিক আনাম খান।

আরো পড়ুন :   বাংলাদেশি সিনেমার সুপারহিরো, সুপারহিরোইন ও সুপারভিলেনদের গল্প

৪. Bangla (2019):- মা, বাবা আর বোনকে নিয়ে ইতালির রোমে বাস করে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফাইম। একটি জাদুঘরে চাকরির পাশাপাশি সে একটি ব্যান্ডে গানও গায়। হঠাৎ তার জীবনে আসে আসিয়া নামের এক সুন্দরী ইটালিয়ান নারী।

কিন্তু সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কৃতি তাদের প্রেমের সামনে এসে দাঁড়ায়। এমনই গল্প নিয়ে ফাইম ভূঁইয়া ২০১৯ সালে নির্মাণ করেন রোমান্টিক কমেডি মুভি Bangla. ফাইম ভূঁইয়ার সাথে ছবিটিতে আরো ছিলেন ক্যার্লোটা এন্টোনিল্লি, সিমন লিবেরাটি প্রমুখ। এই ছবিটিও দর্শকদের মাঝে ভাল সাড়া ফেলেছে।

৫. Banglasia 2.0 (2019):- মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিক হ্যারিস, চরমপন্থী মালয়েশিয়ান নাগরিক হ্যাঙ্গুরিন ও ধনীর দুলালী রিনা’র গল্প নিয়ে মালয়েশিয়ার বিখ্যাত সংগীত শিল্পী নেমউঈ নির্মাণ করেন Banglasia 2.0.

পরিচালক নিজে ছাড়াও সিনেমাটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন বাংলাদেশের নিরব হোসেইন, মালয়েশিয়ার আতিকাহ সুহামি, সাইফুল আপেক প্রমুখ। ২০১৪ সালে সিনেমাটির শুটিং সমাপ্ত হলেও দীর্ঘ ৫ বছর সেন্সরবোর্ডে আটকে থাকার পর অবশেষে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ছবিটি মুক্তির মুখ দেখে এবং ব্যাপক সফলতা অর্জন করে। এর পাশাপাশি নিরবের পারফরম্যান্সও প্রশংসিত হয়। মূলত অ্যাকশন কমেডি সিনেমা হলেও এই ছবিটিতে উঠে এসেছে দুর্নীতি, অসমতা, মানবপাচার, জাতিগত সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক বোঝাপড়ার মত সামাজিক বিষয়াবলী।

আরো পড়ুন :   বাংলাদেশের সিনেমা ও শিল্পীদের জানা-অজানা কিছু ঘটনা ও তথ্য (পর্ব-১)

সবকিছু ঠিক থাকলে এই বছরের নভেম্বরে সিনেমাটির বাংলাদেশী ভার্সন বাংলাদেশে মুক্তি পাবে।

৬. Dhaka (2019):- ভারতের এক ধনী ব্যবসায়ীর সন্তানকে কিডন্যাপ করে ঢাকায় নিয়ে আসে দুর্বৃত্তরা। ছেলেটিকে উদ্ধার করতে ঢাকায় আসে এক আমেরিকান ভাড়াটে সৈনিক। তারপর ঘটতে থাকে একের পর এক রোমাঞ্চকর ঘটনা। এমনই গল্প নিয়ে নেটফ্লিক্সের জন্য Dhaka নামের এই অ্যাকশন থ্রিলার সিনেমাটি নির্মাণ করছেন স্যাম হারগ্রেভ।

সিনেমাটির মূল চরিত্রে আছেন অ্যাভেঞ্জার্সের থর খ্যাত অভিনেতা ক্রিস হেম্সওর্থ, তার সাথে ভারতের মনোজ বাজপেয়ী, রনদীপ হুডা প্রমুখ। দুঃখের ব্যাপার সিনেমাটির নাম “ঢাকা” এবং এর গল্প ঢাকা শহরকে ঘিরে হলেও এই সিনেমাটির শুটিং ঢাকা কিংবা বাংলাদেশের কোথাও করা হয়নি। এর কারন সিনেমার কর্তৃপক্ষরা ঢাকায় এসে শুটিংয়ের জন্য কয়েকটা স্থান পছন্দ করলেও, সকল ধরনের যান চলাচল বা জনসাধারণের যাতায়াত বন্ধ করে সেখানে শুটিং করা সম্বব হবে না।

তাই তারা ঢাকা শহরের রুপরেখা ক্যামেরাবন্দি করে ভারতের আহমেদাবাদ ও মুম্বাইয়ে হুবহু সেট নির্মাণ করেন। এই ব্যাপারে তাদের সার্বিক সহযোগিতা করেন বাংলাদেশের কতিপয় সিনেমা সংশ্লিষ্ট যুবক। সিনেমাটি খুব শীঘ্রই নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাবে।