বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বিরক্তিকর ১০টি সিনেমা

সিনেমার ব্যবসায়িক সফলতা ও ব্যর্থতার মাপকাঠি হিসেবে ব্লকবাস্টার, সুপার হিট, বাম্পার হিট বা ফ্লপ, ডিজাস্টার ইত্যাদি তকমা ব্যবহার করা হয়। সাধারণ দর্শক সাধারণত ইতিবাচক মন্তব্যের জন্য ভাল ছবি, পয়সা উসুল ছবি ইত্যাদি এবং নেগেটিভ মন্তব্যের জন্য ফালতু ছবি, থার্ড ক্লাস ছবি এসব মন্তব্য করে থাকেন। মূলত একটি সিনেমাকে তখনই বাজে সিনেমা বা থার্ড ক্লাস সিনেমা বলা হয় যখন সেই সিনেমা দর্শকদের চাহিদা তো পূরণ করতে ব্যর্থ হয়-ই তার সাথে চরম বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অশ্লীল সিনেমার যুগেও এমন অনেক সিনেমা নির্মিত হতো যেগুলো মানের দিক দিয়ে নিম্নমানের হলেও সিনেমাটিতে এমন কিছু থাকতো যা দর্শকদের বিরক্ত করতো না। আবার এমন অনেক সিনেমা হয়েছে যেগুলো বাইরে থেকে সুশীল মনে হলেও ভিতরে চরম বিরক্তিকর উপাদান ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আজ আমরা আলোচনা করবো ঢালিউডের এমনই ১০টি চরম বিরক্তিকর সিনেমা সম্পর্কে। তবে শুরু করা যাক।

১. রক্তে ভেজা বাংলাদেশ (২০১২):- ছবিটির নাম শুনেই মনে হবে এটি একটি দেশাত্মবোধক চলচ্চিত্র। এবং বাস্তবেই ছবির গল্প গড়ে উঠেছে সমাজের সকল দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামা এক যুবককে কেন্দ্র করে। কিন্তু সেই যুবক তথা নায়ক স্বাধীন কি করেছেন জানেন ? সারা সিনেমাতে শুধু নায়ক মান্নার কণ্ঠ নকল করে ভারী ভারী ডায়লগ বলে দর্শকদের বিরক্ত ও হাসতে বাধ্য করেছেন। সুপারহিরো স্বাধীন ছাড়াও এই ছবিতে আরো আছেন নায়িকা রত্না, খলনায়ক মিশা সওদাগরের মত প্রথম সারির অভিনেতা। কাউকে নকল করে যে সফলকাম হওয়া যায়না বরং হাসির পাত্রে পরিণত হতে হয় তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ এই সিনেমাটি।

২. শিউলীমনি (২০১২):- গান ভালোবেসে সঙ্গীতকে জীবনের ব্রত করে নেওয়া এক তরুণীর গল্প নিয়ে সাদেক সিদ্দিকী নির্মাণ করেন “শিউলীমনি”। নিপুণ, ইমন, মিজু আহমেদ প্রমুখ অভিনীত এই ছবিটি কোন সিনেমা হলে মুক্তি পায়নি। যতদূর জানা যায় প্রথমে এটা ছিল একটি টেলিফিল্ম। যাতে একটি স্বনামধন্য বেসরকারি টিভি চ্যানেলের মালিকের কণ্ঠশিল্পী স্ত্রীকে হাইলাইট করার কারনে চ্যানেলটি টেলিফিল্মটিকে সেন্সর করিয়ে সিনেমা বানিয়ে নিজেদের চ্যানেলে প্রচার করে। একটি টেলিফিল্মটিকে সিনেমা বানিয়ে ফেললে সেটা যে কতখানি সিনেম্যাটিক মনোরঞ্জন দিতে পারবে সেটা আশা করি বুঝিয়ে বলতে হবে না।

আরো পড়ুন :   এবারও সেরা করদাতা শাকিব খান

৩. লাভ ইন জঙ্গল (২০১২):- জন্মের পর মা-বাবা হতে বিচ্ছিন্ন হওয়া টারজানের বনের পশুদের সাহায্যে বেড়ে উঠা ও তার জীবনে প্রেম আসার গল্প নিয়ে ডি এ হোসেন নির্মাণ করেন “লাভ ইন জঙ্গল”। ড্যানি সিডাক, আলিশা, ইলিয়াস কোবরা প্রমুখ অভিনীত এই সিনেমাটি নিম্নমানের গল্প ও চিত্রনাট্য, মানহীন নির্মাণ এবং অসংলগ্ন অভিনয়ের কারনে সিনেমা হলে আগত দর্শকদের গালাগালি অর্জনে সক্ষম হয়। তাছাড়া একই দৃশ্য বারবার দেখানোর কারনে বেশিরভাগ দর্শক একরাশ বিরক্তি নিয়ে সিনেমা হল ত্যাগ করে। ছবিটির প্রচারের সময় বলা হয় দেশের প্রথম মার্শাল আর্টভিত্তিক টারজান সিনেমা। বনের টারজান কিভাবে এবং কার কাছে মার্শাল আর্ট শিখলো তা নিয়ে আজও বিজ্ঞানীরা গবেষণা করছেন।

৪. ভালবাসার তাজমহল (২০১৪):- এক রাজকুমারের সাথে এক সুন্দরী তরুণীর প্রেম, বিয়ে, বিয়ের পর তরুণীটির মরণব্যাধি অসুখে আক্রান্ত হওয়া এবং “ভালোবাসার জোরে” সেই রোগ হতে মুক্তি লাভের গল্প নিয়ে আহসান উল্লাহ মনি নির্মাণ করেন “ভালবাসার তাজমহল”। পরিচালক নিজে ছাড়াও এই সিনেমাটিতে নায়ক-নায়িকার চরিত্রে ছিলেন হিরা ও হেনা। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের সবচেয়ে বিরক্তিকর সিনেমার একটি তালিকা তৈরি করলে আমার বিশ্বাস এই ছবিটি তালিকার উপরের দিকে থাকব। ফোঁক গল্পের নামে থার্ড ক্লাস ঠাকুর মায়ের ঝুলি, যাত্রাপালা টাইপের গান, অভিনয়ের নামে ছ্যাবলামি, কমেডির নামে ভাঁড়ামি, ডায়লগ ডেলিভারি দিতে গিয়ে দাঁত ভাঙ্গার উপক্রম ও মীনা কার্টুন টাইপ সম্পাদনাসহ বিরক্ত হয়ে সিনেমা হলে ভাঙচুর করার মত সব গুণ এই সিনেমাটিতে আছে। যতদূর জানা যায় প্রযোজকের নিজস্ব রাজমনি সিনেমা হল ছাড়া বিশ্বের আর কোন সিনেমা হলে এই অমূল্য সিনেমাটি মুক্তি পায়নি।

৫. প্রেম কি অপরাধ (২০১৪):- এক সন্ত্রাসী যুবক প্রেমে পড়ে যায় এক নিরীহ তরুণীর। কিন্তু সেই তরুণী যুবকটাকে প্রচন্ড ভয় পায় ও ঘৃণা করে, ভালোবাসে অন্য একটি ছেলেকে। এমনই গল্প নিয়ে জাদু আজাদ নির্মাণ করেন “প্রেম কি অপরাধ”। নবাগত স্বাধীন, প্রিয়াঙ্কা ও হৃদয় খান অভিনীত এই ছবিটি রাজ কানোয়ার পরিচালিত; সানি দেওল, কারিশমা কাপুর ও সালমান খান অভিনীত ১৯৯৬ সালের সুপার হিট সিনেমা Jeet এর নকল। এই ছবির নায়ক স্বাধীন প্রমাণ করেছেন আপনার যদি অভিনয়ের “অ”ও জানা না থাকে, আপনার যদি হিরো তো দূরে থাক ভিলেনদের মতও লুক না থাকে, সংলাপ বলতে গিয়ে যদি আপনার মুখে প্যারালাইসিস হওয়ার উপক্রম হয়ে যায়; তারপরও আপনি বাংলাদেশের সিনেমার নায়ক হতে পারবেন। যদি আপনি নিজে বা আপনার মামা-খালু কেউ একজন সিনেমার প্রযোজক হয়। ছবিটির নায়িকা প্রিয়াঙ্কার জন্য আফসোস হয়। শিশুশিল্পী হিসেবে জনপ্রিয় এই তরুণীকে বড় হয়ে এরকম একটি ছবিতে নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করতে হয়েছে। ২০১৪ সালের ভালোবাসা দিবসে মুক্তি পাওয়া এই ছবিটি যারা দেখেছেন তারা এক বাক্যে স্বীকার করেছেন, “প্রেম অপরাধ কিনা জানিনা, তবে এধরনের সিনেমা দেখা অমার্জনীয় অপরাধ।

আরো পড়ুন :   ঢালিউড সুপারস্টারের চুল কাটায় শুটিং বন্ধ "একটি প্রেম দরকার"- এর

৬. পৃথিবীর নিয়তি (২০১৬):- শৈশবে পোড় খেয়ে বিপথগামী হওয়া এক যুবক ও তার চারপাশের জগতের গল্প নিয়ে শেখ শামীম নির্মাণ করেন “পৃথিবীর নিয়তি”। আপাতদৃষ্টিতে ছবির প্রধান চরিত্র নায়ক রুবেলের মনে হলেও, আসলে তার স্টারডমকে কাজে লাগিয়ে তাকে বলির পাঁঠা বানিয়ে শো করে এই মানহীন সিনেমাটি নির্মাণ করা হয়েছে। সিনেমাটির প্রধান চরিত্রগুলোর মধ্যে আরো আছেন নিজের টাকায় নিজের ছবিতে নায়ক হওয়া রাশেদ মোর্শেদ, সানজানা, রাভিনা প্রমুখ। মূলত চলচ্চিত্রের ইঁদুর দৌড়ে টিকে থাকার জন্য এক সময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা রুবেল এই ছবিটির মত কিছু মানহীন সিনেমায় কাজ করে বর্তমান প্রজন্মের কাছে নিজের ইমেজ নষ্ট করেছেন।

৭. শেষ কথা (২০১৭):- পুতুল নাচের ইতিকথা নিয়ে গবেষণায় নামা এক তরুণীর গল্প নিয়ে সৈয়দ অহিদুজ্জামান ডায়মন্ড নির্মাণ করেন নিরীক্ষাধর্মী সিনেমা “শেষ কথা”। কলকাতার সমদর্শী দত্ত, আইরিন সুলতানা, রাইসুল ইসলাম আসাদ প্রমুখ অভিনীত এই সিনেমাটি ঈদে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে প্রচারিত হয়। এছাড়া আর কোন উপায়ও ছিল না। কারণ এর আগে আমাদের দেশে অনেক নিরীক্ষাধর্মী সিনেমা নির্মিত হয়েছে, সেগুলো ব্যবসায়িক সফলতা না পেলেও প্রশংসিত ও পুরস্কৃত হয়েছে। এই পরিচালকেরই নাচোলের রাণী, গঙ্গাযাত্রা ও অন্তর্ধান সিনেমাগুলো অফট্র্যাকের হলেও প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু তার এই সিনেমাটিতে এমন কিছু ছিল না যে সেটাকে প্রশংসা করা তো দূরে থাক সহ্য করা যায়। একটি বোরিং গল্প কচ্ছপের মত এগিয়ে গিয়ে ঢুপ করে শেষ হয়ে গেছে।

৮. আলোয় ভুবন ভরা (২০১৯):- ঢাকার এক সন্ত্রাসীর অত্যাচারের শিকার হয়ে নেপালে চলে আসে এক যুবক, তার প্রেমিকা আলো ও আলোর বাবা। তাদের গল্প নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করতে আগ্রহী হয় সেখানে শুটিং লোকেশন দেখতে আসা এক নারী চিত্রপরিচালক। এমনই গল্প নিয়ে আমীরুল ইসলাম নির্মাণ করেন “আলোয় ভুবন ভরা”। সাইফ খান, মিষ্টি মারিয়া, অরুণা বিশ্বাস প্রমুখ অভিনীত একঘেঁয়েমিতে ভরা এই সিনেমাটি দেখলে আপনার মনে হবে একদল লোক নেপালে পিকনিক করতে গিয়ে শখ করে সেখানে কিছু ভিডিও করে সেগুলো জোড়াতালি দিয়ে সাজিয়ে “সিনেমা” বানিয়ে সেন্সরবোর্ডে পাঠিয়ে সেন্সর ছাড়পত্র আদায় করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেছেন। আর সেটা বরাবরের মত ঈদের দিন নিজেদের টিভি চ্যানেলে প্রচার করে অগণিত মানুষের ঈদের আনন্দ মাটি করেছে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল।

আরো পড়ুন :   সেন্সরবোর্ডের ঝামেলার শিকার হওয়া ১০টি বাংলাদেশী চলচ্চিত্র

৯. ভালোবাসার উত্তাপ (২০১৯):- জটিল রোগের চিকিৎসা করাতে চাচার সাথে নেপালে আসে এক তরুণী। সেখানে তাদের এক পরিচিত যুবকের সাথে তার জড়িয়ে পড়া ও তার চাচার অতীত সামনে আসার গল্প নিয়ে শহীদুল আলম সাচ্চু নির্মাণ করেন “ভালোবাসার উত্তাপ”। মিষ্টি মারিয়া, ইমন, অরুণা বিশ্বাস প্রমুখ অভিনীত ছবিটি এতটাই বিরক্তিকর যে ছবিটি সিনেমা হলে মুক্তি দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় ঈদের তৃতীয় দিন একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে প্রিমিয়ার করে দর্শকদের দেখতে বাধ্য করা হয়। সম্ভবত “আলোয় ভুবন ভরা” সিনেমার মত এই ছবিটাও একই সাথে নেপালে পিকনিক করতে গিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে।

১০. গোয়েন্দাগিরি (২০১৯):- একটি ভূতুড়ে বাড়ির রহস্য উন্মোচন করতে মাঠে নামে একদল শখের গোয়েন্দা। ঘটতে থাকে একের পর এক অদ্ভুতুড়ে ঘটনা। এমনই গল্প নিয়ে নাসিম সাহনিক নির্মাণ করেন “গোয়েন্দাগিরি”। ছবিটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন কল্যাণ কোরাইয়া, তানিয়া বৃষ্টি, ইশরাত চৈতি প্রমুখ। যারা আকর্ষণীয় নাম ও গল্পের কারণে সিনেমাটি দেখার নিয়ত করেছেন তাদের জন্য রইলো অগ্রিম সমবেদনা। আর যারা সিনেমাটি ইতিমধ্যে দেখে ফেলেছেন, তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। গোয়েন্দাগিরি’র নামে সস্তা ও মানহীন থ্রিলার গল্পের এই চলচ্চিত্রটি শার্লক হোমস, ফেলুদা বা ব্যোমকেশ বক্সী দেখে ফেললে নির্ঘাত সুইসাইড খেতেন। কাকরাইলের মাত্র একটি সিনেমা হলে মুক্তি পেতে সক্ষম হওয়া এই সিনেমাটি শেষ পর্যন্ত দেশের একটি স্বনামধন্য টিভি চ্যানেল ঈদুল আজহার দিন প্রিমিয়ার করে দেশবাসীকে ঈদের উপহার প্রদান করেন।