নয়নাভিরাম ভোলাগঞ্জ : পর্যটনের অপার সম্ভবনা

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব লীলাভূমি সিলেট। অসংখ্য সুন্দর ও মনোরম জায়গা রয়েছে সিলেটে। আর সিলেটের একটি অন্যতম সুন্দর স্থান ভোলাগঞ্জ। সিলেট শহর থেকে ভোলাগঞ্জের দূরত্ব ৩৩ কিলোমিটার।

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত ভোলাগঞ্জে দেশের সর্ববৃহৎ পাথর কোয়ারির অবস্থান। মেঘালয় রাজ্যের খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে বর্ষাকালে ঢল নামে। ধলাই নদীতে ঢলের সাথে নেমে আসে পাথর। পরবর্তী বর্ষার আগমন পর্যন্ত চলে পাথর আহরণ।

ভোলাগঞ্জের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ধলাই নদী। এখানে ধলাই নদীর মনোলোভা রূপ, সবুজ পাহাড়, পানির ওপর আকাশের নীল ছায়া, দূরের পাহাড়গুলোর উপর মেঘের ছড়াছড়ি, ঝর্ণার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, নদীর টলমলে হাঁটু পানির তলায় বালুর গালিচা, চিক চিক করা রূপালী বালু আর ছোট বড় সাদা অসংখ্য পাথর মিলে এ যেন কোন এক মায়াবি রাজ্য।

অসাধারণ প্রাকৃতিক শোভার স্থান এই ভোলাগঞ্জ। সাথে বাড়তি পাওনা হিসেবে পাবেন ধোলাই নদীর নয়নাভিরাম সৌন্দর্য। চারদিকে শুধু সাদারঙা পাথর আর পাথর। পাথর তোলার প্রচুর নৌকা দেখতে পাবেন এখানে। নির্জন নৈসর্গিক এই জায়গাটিতে সামনে সবুজ পাহাড়ের সারি, পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া প্রচণ্ড স্রোতের স্বচ্ছ শীতল জল। এই জলে অবগাহন করে সকল ক্লান্তি-অবসাদ নিমিষেই দূর করতে পারবেন। মন-প্রাণ হয়ে উঠবে সতেজ ও প্রাণবন্ত। পানি আর সাদা পাথরের জাদুকরী শীতল স্পর্শ আপনাকে নিঃসন্দেহে বিমোহিত করবে।

আরো পড়ুন :   সিলেটে ইফতারের প্রিয় খাবার পাতলা খিচুড়ি

সাদা সাদা পাথর ছড়ানো এই জায়গাটি দেখতে অবিকল বিছানাকান্দির মতো। এ যেন সাদা পাথরের আরেক বিছানাকান্দি। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে বন্যার তোড়ে নদী ও ছড়া দিয়ে প্রচুর পাথর ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারিতে জমা হয়। যা সারা বছর উত্তোলন করে থাকেন শ্রমিকরা। উপভোগ করা যায় পাথর উত্তোলনের দৃশ্য।

১৯৬৪-১৯৬৯ সাল পর্যন্ত সময়কালে সোয়া দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে প্রকল্প। রোপওয়ের জন্য নির্মাণ করা হয় ১২০টি এক্সেক্যাভেশন প্লান্ট। এক্সেক্যাভেশন প্লান্টের সাহায্যে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত পাথর উত্তোলন করা হলেও পর্যাপ্ত লোকবল ও বিকল ইঞ্জিনের কারণে ১২ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে।

মজার ব্যাপার হলো, এলাকাটি দেখতে অনেকটা ব-দ্বীপের মতো। ধলাই নদী বাংলাদেশ অংশে প্রবেশ করে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে প্ল্যান্টের চারপাশ ঘুরে আবার একীভূত হয়েছে। রোপওয়ের এরিয়া প্রায় একশ একর। আর এ কারণেই স্থানটি পর্যটকদের কাছে এত আকর্ষণীয়।

পৃথিবীর সর্বাধিক বৃষ্টিবহুল এলাকা চেরাপুঞ্জির অবস্থান ভারতের পাহাড়ি রাজ্য মেঘালয়ে। ধলাই নদীর উজানে এ রাজ্যের অবস্থান। খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড় ঘেরা এ রাজ্যের দৃশ্য বড়ই মনোরম। ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে এলাকায় অবস্থান করে পাহাড় টিলার মনোরম দৃশ্যাবলী অবলোকন করা যায়। সবুজে মোড়া পাহাড়ি এই সৌন্দর্য আপনাকে বিমুগ্ধ করবে।

আরো পড়ুন :   লন্ডনে বিশ্বকাপ তাই বাড়ি আসছেন না সিলেটীরা

এখানে রয়েছে ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশন। এই স্টেশন দিয়ে আমদানি রপ্তানি কার্যক্রম চলে। এ স্টেশন দিয়ে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা প্রধানত চুনাপাথর ও কয়লা আমদানি করে থাকেন। চুনাপাথর নিয়ে প্রতিদিন শত শত ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সীমান্তের জিরো লাইনে এ কাস্টমস স্টেশনের অবস্থান। চাইলে এখান থেকেও ঘুরে আসা যায়।

যাওয়ার উপায়:

বাস: ঢাকা থেকে সিলেট এর উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে যায় গাবতলী এবং সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে। বাস গুলো সকাল থেকে রাত ১২.৪৫ পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময় পরপর ছেড়ে যায়। ঢাকার ফকিরাপুল, সায়দাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে সিলেটের বাসগুলো ছাড়ে। এ পথে গ্রিন লাইন পরিবহন, সৌদিয়া পরিবহন, শ্যামলী পরিবহন ও এনা পরিবহনের বাস চলাচল করে। ভাড়া ৮শ’ থেকে ১ হাজার ১শ’ টাকা। এছাড়া শ্যামলী পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, ইউনিক সার্ভিস, এনা পরিবহনের পরিবহনের নন এসি বাস সিলেটে যায়। ভাড়া ৪শ’ থেকে সাড়ে ৫শ’ টাকা। এনা পরিবহনের বাসগুলো মহাখালী থেকে ছেড়ে টঙ্গী ঘোড়াশাল হয়ে সিলেট যায়।

ট্রেনে: ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে মঙ্গলবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে ছেড়ে যায় আন্তঃনগর ট্রেন পারাবত এক্সপ্রেস। সপ্তাহের প্রতিদিন দুপুর ২টায় ছাড়ে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস এবং বুধবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন রাত ৯টা ৫০ মিনিটে ছাড়ে উপবন এক্সপ্রেস। শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন বিকাল ৪ টায় ছাড়ে কালনী এক্সপ্রেস। ভাড়া দেড়শ থেকে ১ হাজার ১৮ টাকা।

আরো পড়ুন :   আবেগে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছি: ফেরদৌস

আকাশপথে: ঢাকা থেকে বিমানযোগেও সিলেট যেতে পারেন। এজন্য শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ, ইউএস বাংলা এয়ার, নভো এয়ার, ইউনাইটেড এয়ার, রিজেন্ট এয়ারের বিমানে করে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাওয়া যাবে।

সিলেট থেকে ভোলাগঞ্জ:

সিলেট থেকে ভোলাগঞ্জ যাওয়ার সরাসরি কোন যানবাহন নেই। যাতায়াতের একমাত্র বাহন সিএনজিচালিত অটোরিকশা, জনপ্রতি ভাড়া ২৫০ টাকা। রাস্তাটা বেশ খারাপ। তাই নদীপথ বেছে নেওয়াই ভালো। জনপ্রতি খরচ হবে ২০০ টাকা করে। ভোলাগঞ্জ থেকে সিলেট বাদাঘাটের শেষ ট্রলার ছেড়ে আসে বিকেল চারটায়। সে ক্ষেত্রে সময়ের ব্যাপারটা মাথায় রাখতে হবে। নদীপথে যাতায়াতে একটু বাড়তি সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে। সম্ভব হলে সঙ্গে লাইফ জ্যাকেট রাখবেন। শুকনা খাবার ও প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ সঙ্গে রাখবেন।

কোথায় থাকবেন:

থাকার জন্য আপনাকে সিলেট শহরে ফিরে আসতে হবে। সিলেটে থাকার মত অনেকগুলো আবাসিক হোটেল ও রিসোর্ট আছে। আপনি আপনার প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী যেকোনো ধরনের হোটেল পাবেন। তাদের মধ্যে কয়েকটি হচ্ছে।

তথ্য সূত্র : ইন্টারনেট ও স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ