দুঃখ সয়ে যাওয়া ‘দুখাই’ : রহমান মতি


পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি – দুখাই
পরিচালক – মোরশেদুল ইসলাম
শ্রেষ্ঠাংশে – রাইসুল ইসলাম আসাদ, রোকেয়া প্রাচী, চাঁদনী, নাজমা আনোয়ার, আমিরুল হক চৌধুরী, আবুল খায়ের প্রমুখ।
মুক্তি – ২২ জুলাই ১৯৯৭

‘১২ ই নভেম্বর ১৯৭০। শতাব্দীর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে দেশের উপকূলীয় এলাকার দশ লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারায়’

ছবি শুরুর আগে এভাবেই দেখানো হয় তথ্যটি। স্বাধীনতার আগে সত্তর দশকের শুরুর বছরের এই ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের উপর ভিত্তি করে গুণী নির্মাতা মোরশেদুল ইসলামের মাস্টারপিস ছবি ‘দুখাই।’

বাংলাদেশ যেমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগেরও দেশ। এ দুটি একদম হাত ধরাধরি চলে। আমরা দেশের চিরায়ত প্রকৃতি দেখে যেমন মুগ্ধ হই আবার সেই প্রকৃতিরই ভয়ঙ্কর তাণ্ডবে প্রিয়জন, বাসস্থান, সম্পদ হারিয়ে আহাজারিও করি। এই বাস্তবতা উপকূলীয় অঞ্চলে বা দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ঘটে। বঙ্গোপসাগরের একটা প্রভাব থেকে যায় এ অঞ্চলে এবং খুব বেশি খারাপ অবস্থা ঘটলে তার রেশ সারাদেশে ঘটে। ইতিহাসে সত্তর দশকের সেই ঘূর্ণিঝড়কে ঘিরেই ‘দুখাই’ ছবি। ছবিটি দেখার সময় দর্শক তাই বাস্তবটাই দেখবে, মনে হবে না যে ছবি দেখছে। চোখের সামনে ঘটে যাওয়া প্রকৃতির নিদারুণ রূপ দেখবে।

আরো পড়ুন :   আর খালিদ হোসেনের কণ্ঠে শোনা যাবে না নজরুল সঙ্গীত

ছবির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন আমাদের গর্বিত অভিনেতা রাইসুল ইসলাম আসাদ। তাঁর থেকে বেটার চয়েজ আর কেউ হতে পারত না এ ছবিতে দর্শকের বারবার মনে হবে কথাটা। দীর্ঘ প্রস্তুতি রেখে পরিবেশ-পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে তিনি অভিনয় করেছেন। তারই জীবনের গল্প ছবিতে সত্তর দশকের সেই ঘূর্ণিঝড়ে সর্বস্ব হারানোদের একজন হয়ে অনেকের গল্প বলেছেন পরিচালক।

আসাদের জীবন তার পরিবারের সাথে ভালোই কাটছিল। নদীভাঙনে পড়ে জায়গা বদল করে সাগরপাড়ে নতুন বসতি গড়ে তারা। নিজেদের জীবনযুদ্ধকে বরণ করে নেয়। কিন্তু কে জানত দুখাই আসাদের ভাগ্যে কি অপেক্ষা করছে! তার স্বাভাবিক জীবনটা বদলে যায় ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে। নতুন করে আবারো বাঁচার স্বপ্ন দেখে আসাদ। কিন্তু নাম যার দুখাই সাময়িক সুখের পর দুঃখ তার জীবনে না এসে কি পারে!

ছবিতে সূক্ষ্ম কিছু জীবনছবি আছে যেগুলো নির্মাতা মোরশেদুল ইসলামের অসাধারণ মুন্সিয়ানার দক্ষতা। পয়েন্ট করে বলা যায় :

  • নদীভাঙনের পর আসাদ তার পরিবারের সাথে সাগরপাড়ে নতুন বসতি গড়ে। ফসল ফলানোর জন্য জমিতে লাঙল চালায়। হালের একটা গরু থাকাতে একদিকে আসাদ নিজেই দাঁড়ায় লাঙল টানতে। দৃশ্যটি এতটা হৃদয়স্পর্শী যে কারো বুকে গিয়ে লাগবে।
  • আগের দিনে মাঠে কাজ করতে যাওয়া পরিবারের মানুষদের জন্য খাবার নিয়ে যেত। আসাদ ও তার বাবার জন্য খাবার নিয়ে যায় তার বোন। মরিচ কামড়ে মুড়ি খায় তারা কাজের ফাঁকে। মুড়ি, মরিচ নিম্নবিত্তের খাবারের একটা সূক্ষ্ম দৃশ্যায়ন ছিল।
  • আসাদের বিয়ের সময় দেখা যায় ঘরের মাঝখানে শাড়ি টাঙিয়ে দেয়ালের মতো আবরণ তৈরি করা হয়। তারপর বিয়ে পড়ানো হয়। তখনকার গ্রামীণ জীবনের একদম সূক্ষ্ম দৃশ্য এটা।
  • জামাই দুখাই গেছে প্রথমবারের মতো শ্বশুরবাড়িতে। জামাইকে সাধারণ গ্লাসে করে শরবত দেয়া যায় না। কাঁসার গ্লাসে করে শরবত দেয়া হয়। কাঁসার জিনিসপত্র তখনকার দিনে খুব নামকরা ছিল এবং ঐতিহ্যের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
  • মেয়ের জন্য গণ্ঞ্জ থেকে বাতাসা, কাঁচের চুঁড়ি নিয়ে আসে আসাদ তার অভিমান ভাঙানোর জন্য। মেয়েদের জন্য বাতাসা, চুঁড়ি ছিল তখনকার দিনে অনেককিছু।
আরো পড়ুন :   মতিন রহমানের ‘রাঙাভাবী’: যে গল্পের ছবি আজো হয়না

ছবির মূল টার্গেট ছিল ট্র্যাজেডি তুলে ধরা। দুখাই আসাদের জীবনে অসহনীয় ট্র্যাজেডি ঘটে। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে তাঁর জীবনে একটা গল্প তৈরি হয়। এর মধ্যবর্তী অংশে দেখানো হয় দুর্যোগের পরও জীবনযুদ্ধে নতুন করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। এটাই সবচেয়ে বড় চেতনা ছবির। জীবন থেমে থাকবে না যত দুর্যোগই আসুক বাঁচতে হবে প্রকৃতির সাথে লড়াই করে। এছাড়া ছবিতে মুক্তিযুদ্ধের আংশিক উপস্থাপন ছিল বিশেষ কিছু।

দুখাই চরিত্রে আসাদের তুলনা আসাদ নিজে। তাঁর কান্নার অভিনয় দর্শককে কাঁদানোর ক্ষমতা রাখে। আসাদের স্ত্রীর চরিত্রে রোকেয়া প্রাচী অসাধারণ। তাঁর ন্যাচারাল অভিনয় মুগ্ধ করে। তাদের মেয়ের ভূমিকায় চাঁদনীও মিশে গেছে চরিত্রের সাথে। আসাদের মা-বাবার চরিত্রে নাজমা আনোয়ার ও আমিরুল হক চৌধুরী অসাধারণ। আবুল খায়ের একটি বিশেষ ভূমিকায় পেশাদার অভিনেতার কাজ করেছেন।

আরো পড়ুন :   বাংলাদেশের যত ভৌতিক সিনেমা

দুর্যোগ সম্পর্কে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ –
দুর্যোগ পূর্ববর্তী ব্যবস্থা
দুর্যোগকালীন ব্যবস্থা
দুর্যোগ পরবর্তী ব্যবস্থা
তিনটিই দুর্যোগ মোকাবেলা ও সচেতনতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দেশে ‘আইলা, নার্গিস, মালা’ এবং বর্তমানে ‘ফণি’ নামের ঘূর্ণিঝড় সবগুলোর জন্যই এগুলো কার্যকর।

প্রকৃতি তার সৌন্দর্যে আমাদের মুগ্ধ করে আবার সেই প্রকৃতির উপর মানুষ যদি অত্যাচর করে তবে সেই প্রকৃতিই ফুঁসে ওঠে জবাব দিতে। তাই প্রকৃতিকে রক্ষায় আমাদের উদ্যোগ নিতে হবে ব্যক্তিগত, দলীয় এবং জাতীয়ভাবে। তবেই দুর্যোগ কমবে। ‘দুখাই’ ছবিটি আমাদের এ শিক্ষাই দিয়ে যায়।