আমেরিকার ক্রিকেট যাত্রা : হাসনাইন আকিফ

২৩ এপ্রিল আইসিসির ডিভিশন টু টুর্নামেন্ট চলাকালীন ওয়ানডে স্ট্যাটাস পেয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (ইউএসএ)

“আমেরিকা আবার ক্রিকেট খেলে নাকি”-এই ধারনা কিন্তু অনেকের ভেতরেই ছিলো কিছুদিন আগেও। ক্রিকেট কিন্তু ইতালি, জার্মানি, স্পেন এই দেশ গুলোও এখন খেলে! কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ক্রিকেটের ইতিহাস অনেক পুরাতন।

আমেরিকা অঞ্চলের দুই দেশ কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্র দলের ক্রিকেট ইতিহাস একই সূত্রে গাঁথা।

১৮৪৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক শহরের সেন্ট জর্জস ক্রিকেট ক্লাব মাঠে মুখোমুখি হয়েছিলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা। অর্থাৎ আইকোনিক এশেজ সিরিজ শুরুর বেশ আগেই।

সেই ম্যাচে প্রায় ২০ হাজার দর্শক হয়েছিলো। বিশ্বাস করতে কিন্তু একটু কষ্টই হবে! বাজিকরেরা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ডলারের লেনদেন করেছিলেন সেই ম্যাচে, ১৮৪৪ সালে! যা আজকের বাজারে ৩ মিলিয়ন ডলারের সমান!

এইউটিওয়াই কাপ হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে প্রথম এবং সবচেয়ে দীর্ঘসময় ধরে চলা দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেট টুর্নামেন্ট বা সিরিজ।

যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডের মধ্যেকার এই সিরিজ চলছে সেই ১৮৪৪ সাল থেকে। শুরুর পর থেকে ১৫০ বছর পর্যন্ত প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয়েছে। এক বছর কানাডায় হলে পরের বছর ইউএসএ-তে। ১৯৯৪ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বন্ধ থাকার পর পুনরায় ২০১২ সালে শুরু হয়।

অটি কাপের শেষ আসর বসেছিলো ২০১৭ সালে কানাডার টরেন্টোতে। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ইউএসএ।

অটি কাপে মোট তিনটা ম্যাচ হয়। একটা ২-দিনের ম্যাচ, একটা ৫০-ওভার এবং অন্যটি ২০-ওভার ম্যাচ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস থেকে জানা যায় তাদের প্রথম প্রেসিডেন্ট এবং ফাউন্ডিং ফাদার জেনারেল জর্জ ওয়াশিংটন খুব ক্রিকেট ভালবাসতেন। আমেরিকান রেভ্যুলেশন চলাকালীন ভ্যালি ফোর্জে তার সৈন্যদের নিয়ে প্রায়ই ক্রিকেট খেলতেন।

ক্রিকেটের এই উন্মাদনা অবশ্যই ব্রিটিশদের দেখাদেখি!

তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ছোটবড় অসংখ্য ক্লাব ছিলো যার বেশিরভাগ ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ক্রিকেটারদের মাধ্যমে চলতো।

আরো পড়ুন :   কান্নায় ভেঙে পড়লেন তাসকিন

“ক্রিকেট ক্লাবের লিডারদের নাম যদি প্রেসিডেন্ট হয় তাহলে নতুন জাতির লিডারের নাম কেন প্রেসিডেন্ট হতে পারবেনা”-জন এডামস কংগ্রেসে দাঁড়িয়ে এই প্রস্তাব রেখেছিলেন ১৭৮৮ সালে।

১৮৬০ সালের পর থেকে বেসবল ক্রিকেটের জায়গা দখল করে নিতে থাকে।

১৯১৩-১৯১৬ সাল পর্যন্ত কয়েকবার অস্ট্রেলিয়া দল যুক্তরাষ্ট্র সফরে এসে প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ খেলেছিলো।

সমগ্র যুক্ত্ররাষ্ট্রে বেজবলের রাজত্ব চললেও ফিলাডেলফিয়া ছিলো ব্যতিক্রম। ক্রিকেটই ছিলো এই শহরের জনপ্রিয় খেলা। ফিলাডেলফিয়া ক্রিকেট দল ছিলো স্বীকৃত প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেট দল।

“জেন্টেলমেন অব ফিলাডেলফিয়া” ছিলো দলের নাম। জেন্টেলম্যান বলা হত তারা যাদের পারিবারিকভাবে অনেক ধনসম্পদ থাকায় জীবিকার অন্য কোন কাজ না করে ক্রিকেটে সময় দিতো।

এই দল বিশ্বের বিভিন্ন জায়াগায় সফর করতো। তবে মূলত অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড এবং কানাডার বিপক্ষেই বেশি ম্যাচ খেলেছে।

মোট ৩৫ বছর টিকে ছিলো এই দল। ৮৯ ম্যাচের ভেতর ২৯ ম্যাচে জয় এবং ৪৬ ম্যাচে পরাজিত হয়, ড্র হয় ১৩ ম্যাচ।

১৮৯৩ সালে এশেজ শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে পূর্ন শক্তির অস্ট্রেলিয়া দল ফিলাডেলফিয়াতে যাত্রা বিরতি দেয়। ২৯ সেপ্টেম্বর তারা জেন্টেলমেন টিমের বিপক্ষে তিন দিনের প্রথম শ্রেনীর ম্যাচে অংশ নেয়।

ফিলাডেলফিয়া ৫২৫ রানের বিশাল সংগ্রহ পায় আগে ব্যাট করে। ব্যাট করতে নেমে জন বারটন কিং এর সুইং বোলিং সামলাতে না পেরে ১৯৯ রানে অল-আউট হয় অজিরা। বারটন কিং ৭৮ রানে ৫ উইকেট নেন। ফলো-অনের শিকার অজিরা দ্বিতীয় ইনিংসে অল-আউট হয় ২৬৮ রানে।

ইনিংস এবং ৬৮ রানে পরাজিত হয় অস্ট্রেলিয়া।

সম্পূর্ণ ক্রিকেট কমিউনিটি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো যে অস্ট্রেলিয়া একটা শহরভিত্তিক দলের কাছে হেরে গিয়েছে।

অজি অধিনায়ক জ্যাক ব্ল্যাকহাম ফিলাডেলফিয়ার অধিনায়ককে বলেছিলেন-

আরো পড়ুন :   ফক্স ক্রিকেটের আনলাকি ইলেভেনে ইমরুল কায়েস

“You have better players here than we have been led to believe. They class with England’s best.”

জন বারটন কিং ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র তথা আমেরিকা অঞ্চলের সেরা ক্রিকেটার।

মাত্র ৬৫ প্রথম শ্রেনীর ম্যাচে তিনি ৪১৫ উইকেট নিয়েছিলেন। ৩৮ বার ছিলো ৫-উইকেট। ম্যাচে ১০-উইকেট ১১ বার।

এই দলটা ১৮৯৭ সালে ইংল্যান্ড সফরে যায়। ১৭ জুন সাসেক্সের বিপক্ষে মাঠে নামে। বারটন কিং এর ১৩ রানে ৭ উইকেটের বিধ্বংসী বোলিং সামলাতে না পেরে ৪৬ রানে অল-আউট হয় সাসেক্স। দ্বিতীয় ইনিংসে কিং ১০২ রানে ৬ উইকেট নেন, ফেলাডেলফিয়া ম্যাচ জিতে ৮ উইকেটে।

ওয়ারউইকশায়ারের বিপক্ষে জেতা ম্যাচে কিং ৯৫/৫ এবং ৭২/৭ ফিগারের পাশাপাশি ৪৬ রান করেন।

১৯০৩ সালের ইংল্যান্ড সফরে বারটন কিং শক্তিশালী এমসিসি দলের বিপক্ষে ৫১ রানে ৭ উইকেট নিয়েছিলেন লর্ডসে।

তারপর আসে ল্যাঙ্কাশায়ারের বিপক্ষে সেই ম্যাচ! আগে ব্যাট করা ল্যাঙ্কাশায়ারের বিপক্ষে ২৭ ওভার বল করে ৪৬ রানে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন কিং। দ্বিতীয় ইনিংসে ল্যাঙ্কাশায়ারের প্রথম পাঁচ ব্যাটসম্যানকে বোল্ড করেন তিনি, ৭ রানে ৫ উইকেট নেয়ার পর আহত হয়ে মাঠ ছাড়েন। মাঝে একটা রান আউট। কিং ফিরে এসে আবারা টানা চার উইকেট নেন। ইনিংসে ৬২ রানে ৯ উইকেট! ফেলাডেলফিয়া ম্যাচ জেতে নয় উইকেটে ৩য় দিন সকালেই।

সফরের শেষ ম্যাচে যেন বের হয়ে আসে অল-রাউন্ডার কিং এর পরিচয়। সারের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ব্যাট হাতে ৯৮ রানে রান-আউট হবার পর বল হাতে ৮৯ রানে ৩ উইকেট নেন। দ্বিতীয় ইনিংসে ক্যারিয়ার সেরা ১১৩* রানের পর বল হাতে ৯৮ রানে ৩ উইকেট নিয়ে ফেলাডেলফিয়াকে ১১০ রানের জয় এনে দেন।

আরো পড়ুন :   মেসি জাদুতে চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে বড় জয় বার্সার

যাইহোক তার বোলিং ছিলো “the angler” যার কারনে সুইং বোলিং নিখুঁত হতো। যা আজও সিমাররা অনুকরণ করেন!

ব্র‍্যাডম্যানের ভাষায় কিং হচ্ছেন-

“America’s greatest cricketing son”

যাইহোক ইউএসএ ১৯৭৯ সালে প্রথম আইসিসি ট্রফি খেলেছিলো। বাংলাদেশের প্রথম আইসিসি ট্রফিও সেটাই।

২০০৪ সালে আইসিসি সিক্স ন্যাশনস চ্যালেঞ্জ কাপে স্কটল্যান্ড, নামিবিয়া, নেদারল্যান্ডস, আরব আমিরাতকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয় তারা এবং যার সুবাদে ২০০৪ ইংল্যান্ড চ্যাম্পিয়নস ট্রফি খেলার সুযোগ পায়।

চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে প্রথম ওয়ানডে খেলে ইউএসএ। আসরে নিউজিল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুটি ওয়ানডে খেলে পরাজিত হয় তারা।

মাঝখানে নানানরকম ঝড়ঝাপটা পার করে ২০১০ সালে নতুন করে যাত্রা শুরু করে তারা।

২০১০ সালে ডিভিশন ফাইভ ফাইনালে নেপালের কাছে পরাজিত হয়, কিন্তু ডিভিশন ফোরে প্রমোশন পায়।

২০১০ ডিভিশন ফোরে ইতালিকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ডিভিশন থ্রি তে প্রমোশন পায়।

২০১১ ডিভিশন থ্রি তে লাস্ট হয়ে আবার ডিভিশন ফোরে চলে যায়।

২০১২ ডিভিশন ফোরে দ্বিতীয় হয়ে আবার ডিভিশন থ্রি তে ফিরে আসে।

২০১৮ ডিভিশন থ্রি তে সিঙ্গাপুরকে হারিয়ে প্রথম বার ডিভিশন টু তে উঠে আসে।

এবং ২০১৯ ডিভিশন টু তে ৩ ম্যাচ জিতে ৬ পয়েন্ট অর্জন করে টপ ফোরে থাকা নিশ্চিত করে এবং পরের আসরের আগ পর্যন্ত ওডিআই স্ট্যাটাস নিশ্চিত করে।

পরের আড়াই বছরে ইউএসএ আইসিসি নির্ধারিত ৩৬ টি ওয়ানডে খেলার গ্যারান্টি পাচ্ছে। পাশাপাশি অন্য দেশকে রাজি করাতে পারলে আইসিসি ফিক্সচারের বাইরেও ম্যাচ খেলার সুযোগ তো থাকছেই।

এছাড়া আইসিসির সব দেশকে আন্তর্জাতিক টি২০ স্বীকৃতি দেয়ার সুবাদে তাদের আগে থেকেই আন্তর্জাতিক টি-টুয়েন্টি খেলার সুযোগ রয়েছে।

উল্লেখ্য টুর্নামেন্ট শুরুর সময়েই আমি বলেছিলাম ইউএসএ এবার ওয়ানডে স্ট্যাটাস পেতে পারে।

এডমিন, ক্রিকসেল

Leave a Reply

Your email address will not be published.